সদ্য সংবাদ

  করোনা: প্রশান্ত মহাসাগরে ১০ মাস নৌকায় ভাসছে শিল্পী দল   রাজশাহী-৪: এমপি এনামুলের বিরুদ্ধে বিয়ে করে প্রতারণা ও ভ্রুণ হত্যার অভিযোগ   ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ চেয়ে রিট   স্পটে কাউকে পাওয়া না গেলে ধরে নেবেন তার চাকরি নেই: মেয়র তাপস   মতামত উপেক্ষা করে গণপরিবহন চালু কার স্বার্থে?  করোনায় তিন ভাগ হবে দেশ   মুন্সিগঞ্জে ইউএনওসহ নতুন করে ২৪ জন করোনা আক্রান্ত  লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি হত্যা: চার’শ মানুষকে লিবিয়ায় পাচারকারী হাজী কামাল গ্রেফতার  কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ উত্তাল যুক্তরাষ্ট্র, ৪০ শহরে কারফিউ   রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্ত আসামি ফের হত্যা মামলায় গ্রেফতার  নারায়ণগঞ্জ জেলার করোনাজয়ী ১০১ পুলিশ সদস্যকে সংবর্ধনা দেয়া হবে কাল  ভারতের তাজমহলে বজ্রপাত, ভেঙে গেল দরজাও  ক্ষতিগ্রস্ত সুন্দরবনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানালেন পার্নো মিত্র  এবার ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ পাস  গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’   দেশে ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৪০ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ২৫৪৫  বর্ধিত বাসভাড়া প্রত্যাখ্যান, পুর্বের ভাড়া বহাল রাখার দাবী যাত্রী কল্যাণ সমিতির   নবীনগরে সেই আমিরুল গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে  যাত্রী নিয়ে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ঢাকা গেলো  সাঘাটায় কৃষকের নিকট থেকে বোরো ধান ক্রয়ে উন্মুক্ত লটারী

নজরুল কাব্যে প্রেম

 Fri, May 25, 2018 10:53 AM
                নজরুল কাব্যে প্রেম

আতিক আজিজ:: মানুষের শক্তি অসীম, তাই তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় বিচিত্র সুর- পুনরাবৃত্তিতে ধরা পড়ে তার দুর্বলতা।

 নব নব সুর ও স্বর-বৈচিত্র্যে রূপ লাভ করে মানুষের সৃজনীশক্তি। এই শক্তিরই নাম প্রতিভা। এই শক্তি যার যত বেশী, সে তত প্রতিভাবান। প্রতিভাবানের মনের পরিধি বহুধা ও ব্যাপকতর- তার কন্ঠেই ধ্বনিত হয় নানা সুর। বিশুদ্ধ বাংলায় এই শক্তিরই বিশেষণ হ”েছ ‘নব নব উন্মেষশালিনী’। নজর“লও অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী তাঁর রচনার পরিধি বহুবিস্তৃত ও বহুমুখী, তাতে ঘটেছে নানা বিচিত্র সুরের সমাবেশ। কিš‘ সাধারণ পাঠক দেখে শুধু তাঁর রাজনৈতিক ও জাতীয় ভূমিকা। ‘যুগ প্রতিনিধি’ তিনি- এ কথার উপরেই বেশী করে জোর দেওয়া হয়। ফলে তিনি যে যুগাতীতেরও কবি সেই বিষয়টি আমরা প্রায় ভুলে যেতে বসেছি।  


জাতীয় কবির ভূমিকা তিনি সার্থকভাবেই অভিনয় করেছেন,এই বিষয়ে সন্দেহ নেই; কিš‘ সঙ্গে সঙ্গে মহৎ প্রতিভার যা ধর্ম তাও তিনি বিস্মৃত হননি; অর্থাৎ, মানব মনের চিরন্তন আকুলি-ব্যাকুলি, প্রেম-বিরহ,ব্যথা-বেদনাকেও তিনি রূপ দিয়েছেন সার্থকভাবে। সাম্প্রদায়িক তো বটেই, জাতীয়তা - আন্তর্জাতীয়তার দ্বন্দ্ব, শ্রেণী সংগ্রাম, পরস্পর বিরোধী সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের কল-কোলাহল একদিন স্বাভাবিক নিয়মেই থেমে যাবে- সেই দিন নিছক এই সব পটভূমিকায় রচিত সাহিত্যেও  হয়ত শুধু ইতিহাসের উপকরণেই পর্যবসিত হবে। কিš‘ মানুষের মতো মানুষের হৃদয়-বেদনাও চিরন্তন, অজর, অমর ও অক্ষয় এবং চির নূতন ও চির -মধুর। 

Our sweetest songs are those that tell of saddest thoughts..কবি –কণ্ঠের এই বাণীর মধ্যে চিরন্তন সত্য শুধু ধ্বনিত নয়, কালের অক্ষয় পটে বিধৃত হয়ে রয়েছে, বলা যায়। কালের কণ্ঠে নজর“ল ও এমনি বহু হৃদয়-বেদনার রঙে রাঙা গানের মালা পরিয়েছেন  এবং কাব্যে দিয়েছেন প্রেম বিরহের মধুময় মুহুর্তকে রূপ। বলাবাহুল্য, সাহিত্যের ইতিহাসে নজর“ল বেঁচে থাকবেন প্রেমের ও ব্যথা-বিরহের কবি হিসেবেই। জাতীয় কবিতা ও সংগীতে তাঁর ছন্দ ও ভাষা যেমন হয়েছে অদম্য ও অগ্নিস্রাবী তেমনি তাঁর  প্রেম -বিরহের সংগীতের ছন্দ ও ভাষা হয়েছে চোখের জলে সিক্ত ও পুষ্প-কোমল। তাঁর হৃদয় বেদনার সঙ্গে একাতœ হয়ে মিশে গেছে প্রকৃতি- বাংলা দেশেরই প্রকৃতি। প্রকৃতির প্রতীক দিয়েই তিনি মানব -মনের চিরন্তন বিরহ-বেদনাকে দিয়েছেন রূপ তাই তা হয়েছে অধিকতর মর্ম স্পর্শী। তাঁর সুবিখ্যাত বিদ্রোহী কবিতাও অসার্থক হতো যদি তাতে শুধু বিদ্রোহ ও ভাঙনের কথাই থাকতো । বিদ্রোহী ও মানুষ তাই তার মুখেই শোভা পায়ঃ

মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী,

 আর হাতে রণতুর্য।

 এই বিদ্রোহী মানুষের মুখে যখন আমরা শুনিঃ 

আমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা,

  ব্যথা সুনিবিড় 

চিত চূম্বন-চোর-কম্পন আমি থর থর থর 

প্রথম পরশ কুমারীর। 

আমি গোপন- প্রিয়ার চকিত চাহনি,

ছল করে দেখা অনুখন,

আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা , তার

  কাঁকন চুড়ির কন কন

আমি চির শিশু চির কিশোর,

আমি যৌবন ভীতু পল্লীবালার আঁচল

  কাঁচলি নিচোর।


তখন বিদ্রোহীর প্রচণ্ড মূর্তি ভুলে গিয়ে আমরা আমাদের চির পরিচিত রক্ত-মাংসে গঠিত মাটির মানুষকে দেখতে পাই, চিনতে পারি। এ না হলে বিদ্রোহী হ’ত অতি মানুষ, বা অ-মানুষ, না হয় বড় জোর খণ্ডিত-মানুষ। কবির প্রতিভা ও পরিমিতি - জ্ঞান এই ভাবে ‘বিদ্রোহী’ কে চিরন্তন মানুষ ও কবিতাকে সার্থক কবিতা করে তুলেছে।


কবি নিজে সকল মানুষ এবং তাঁর রচনায় সর্বত্র ফুটিয়ে তুলেছেন সবল মানুষকে। কাব্যে, সংগীতে,গদ্যে সর্বত্র জয় ঘোষণা করেছেন তিনি সবল মনুষ্যত্বের। তাঁর প্রেম ও সবল মানুষের প্রেম। তার প্রেমে পরিপূর্ন আতœসমর্পন আছে, কিন্তু ন্যাকামি নেই। মান,অভিমান, রাগ, দ্বেষ কিছুই তার প্রেম থেকে বাদ পড়েনি; কিš‘ এই সবকেই রূপ দিয়েছেন তিনি সবল মানুষের মতই। তাঁর প্রথম দিকের প্রেমের কবিতাগুলির মধ্যে ‘ পুজারিণী’ নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রেম-বঞ্চিত কবির হৃদয়-মথিত বেদনার ইতিহাস। কিš‘ কবি হননি উ™£ান্ত, হারাননি আতœপ্রত্যয়, কবির প্রেম সর্বগ্রাহী, কবি চান প্রেয়সীর অখন্ড প্রেম, ‘খন্ডিতা’ র খন্ড প্রেম নিয়ে কবি-চিত্ত তৃপ্তি পান না, তাই খন্ডিতার উদ্দেশ্যে তার ওষ্ঠে ফুটে উঠেছে নির্মম বিদ্র“প ও কঠোর জিজ্ঞাসা ঃ


ছিল আশা ছিল শক্তি বিশ্বটারে টেনে,

ছিড়ে তব রাঙা পদতলে ছিন্ন রাঙা পদ্মসম পূজা দেব এনে।

কিš‘ হায়! কোথা সেই তুমি? কোথা সেই প্রাণ?

কোথা সেই নাড়ী-ছেড়া প্রাণে প্রাণে টান?


    কিš‘ কবির এই অখন্ড ও সুগভীর ভালোবাসার মর্যাদা দেয়নি প্রেয়সী। স্ফটিক-স্ব”ছ কবি-চিত্তকে ফাকিঁ দেওয়া সহজ নয়, সম্ভব নয়Ñ তাই তাঁর এই রোষ-কষায়িত বিদ্র“পঃ

এ তুমি আজ সে-তুমি তো নহে;

আজ হেরি-তুমিও ছলনাময়ী,

তুমিও চাইতে চাও মিথ্যা দিয়া জয়ী।

কিছু মোরে দিতে চাও, অন্য তরে রাখ কিছু বাকী

দুর্ভাগিনী ! দেখে হেসে মরি! কারে তুমি দিতে চাও ফাঁকি? 


কবির দুর্লভ প্রেমকে যে নারী এই ভাবে লাঞ্ছিত করে সে সত্যই দূর্ভাগিনী বৈ কি! অভিশাপ কবিতায় এই দূর্ভাগিনী কবি রীতিমত খোটা দিয়ে অভিশাপ দিয়েছেন বেশ কঠোর ঃ


স্বপন ভেঙে নিশুত রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে

কাহার যেন চেনা ছোঁয়ায় উঠবে ও বুক ছমকে

জাগবে হঠাৎ চমকে!

ভাববে বুঝি আমিই এসে

বসনু বুকের কোলটি ঘেঁসে

 ধরতে গিয়ে দেখবে যখন

শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন!

বেদনাতে চোখ বুজবে

বুঝবে সেদিন বুঝবে।

ভালোবাসা অন্ধ। কবির ভালোবাসার গভীরতা বেশী বলে তাঁর ভালোবাসা অধিকতর অন্ধ। কবি নিজের মন দিয়ে প্রেয়সীর মনকেও বিচার করেছেন। না হয় তিনি অনয়াসেই বুঝতে পারতেন, যে প্রেয়সী তাঁর ভালোবাসাকে অপমান করতে পারে, তার পক্ষে কবিকে বে মালুম ভুলে গিয়ে নতুন প্রেমিকের নবতর প্রেমে মগ্ন হয়ে থাকা বা নিরূপদ্রব শান্তিতে জীবনযাপন করা কিছুমাত্র অসম্ভব নয়। 

পিছু ডাক কবিতাতেও কবি নিজের কল্পনা দিয়েই প্রেয়সীর প্রতি প্রেম জিজ্ঞাসা নিবেদন করেছেনঃ


সখি! নতুন ঘরে গিয়ে আমায় পড়বে কি মনে?

সেথায় তোমার নতুন পূজা নতুন আয়োজনে

প্রথম দেখা তোমার আমায়

যে গৃহ-ছায় যে আঙিনায়,

যেথায় প্রতি ধূলি কণায়,

লতাপাতার সনে।

নিত্য চেনার চিত্ত রাজে চিত্ত আরাধনে,

শূন্য সে ঘর শূন্য এখন কাঁদছে নিরজনে।

আমরা জানি, এ শূন্য গৃহের কান্না নয়, এ বিরহ কাতার কবি- হৃদয়েরই নীরব অশ্র“পাত। সব শিল্পের মূলে রয়েছে প্রেমের প্রেরণা। জীবনের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রেমও বিস্তৃততর ও বহুক্ষেত্রে প্রসারিত হতে পারে। কিš‘ তার সূচনা নারী-প্রেম, তাই কবি মাত্রই প্রেমিক। তাঁর কাব্যজীবনের গোড়াতেই নজর“লও জানিয়েছেন এই স্বীকারোক্তিঃ


তুমি আমায় ভালবাস তাই তো আমি কবি।

আমার এ রূপ -সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি।

আপন জেনে হাত বাড়ালো-

আকাশ বাতাস প্রভাত আলো,

বিদায় বেলার সন্ধ্যা তারা

পূবের অর“ণ রব্-ি

তুমি ভালোবাসো বলে ভালোবাসে সবি।


একজনের ভালোবাসা বিশ্বের ভালোবাসা হয়ে কবি চিত্তকে মাধুর্য মণ্ডিত করে দিয়েছে। এর ফলেই ঘটে কবি চিত্তের স্বপ্নভঙ্গ- কবি মানসের ঘটে নব জাগরণ ও আতেœাপলদ্ধি। তাই কবি বলেছেনঃ


আমার আমি লুকিয়েছিল তোমার ভালোবাসায়,

আমার আশা বাইরে এলো তোমার হঠাৎ আসায়।


কিš‘ তার চেয়েও বড় কথা আতœসমর্পণ - আতœসমর্পণ ছাড়া গভীর ভালোবাসার তৃপ্তি নেই। দিয়ে যে সুখ তার কাছে পেয়ে যে সুখ, সিন্ধুর কাছে বিন্ধুর মতোই। বণিকবৃত্তি কবির ধর্ম নয়, তাই জগতে এক মাত্র কবিই পারে প্রিয়ার গগুদেশের একটি কৃষ্ণ তিলের পরিবর্তে অকাতরে সমরখন্দ ও বোখারা দান করে দিতে। বিদ্রোহী কবি ও বলেছেনঃ


হে মোর রাণী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে।

আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার চরণ তলে এসে।


তিনি যদি কবি না হয়ে শুধু বিদ্রোহী হতেন তা হ‘লে কখনো হার মানতেন না। এই মানার মধ্যেই তাঁর কবি প্রতিভার সার্থকতা। কবি গুর“ রবীন্দ্রনাথও বলেছেনঃ আমি তব মালঞ্চের হব মালাকার। রবীন্দ্রনাথ সৌন্দর্যের কবি তাই মালঞ্চের মালাকর হওয়াই তাঁর পক্ষে চরম আতœসমর্পণ, কিš‘ নজর“ল ব্যথার কবি চোখের জলের কবি, তাই তার আতœসমর্পনঃ


আজ বিদ্রোহীর এই রক্ত রথের চূড়ে,

বিজয়িনী! নীলাম্বরীর আঁচল তোমার উড়ে,

যত তৃণ আমার আজ তোমার মালায় পুরে,

আমি বিজয়ী আজ নয়ন জলে ভেসে।


ভালোবাসার রণে পরাজয়ই তো সত্যিকার জয়!  বিজয়ী হলেও এখানে চোখ অশ্র“ ছলছল করে। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ, এই প্রকৃতির সঙ্গে রয়েছে আমাদের মনের ও ভাবের নিবিড় যোগ। আমাদের প্রেম মিলন বিরহের উপর প্রকৃতির ছায়া না পড়েই পারে না । এই প্রকৃতির মাধ্যমেই আমাদের কবিরা তাদের হৃদয়ানুভুতিকে রূপ দিয়েছেন বারে বারে। চৈতী হাওয়া কবিতায় নজর“লও তাঁর হৃদয়ের বিরহ বেদনাকে প্রকৃতির ভিতর দিয়ে এক অপূর্ব ভাষা মূর্তি দিয়েছেন। এই কবিতাটিতে তাঁর ভাষা পেয়েছে এক অপূর্ব ব্যঞ্জনা।

শূন্য ছিল নিতল দীঘির কালো জল,

কেন তুমি ফুটলে সেথা ব্যথার নীলোৎপল?

আঁধার দীঘির ভাঙলে বুক-

কোন পূজারী নিল ছিঁড়ে? ছিন্ন তোমার দল

ঢেকেছে আছে কোন দেবতার কোন সে পাষাণ তল?


ব্যথা ও বিদ্র“প মিশ্রিত শেষের দুইটি লাইন গভীর অর্থপূর্ণ। এই কবিতাটির প্রত্যেকটি স্তবকে শব্দচয়ন ও প্রকাশ- শক্তির যে অসাধারণ নৈপুণ্য ও তার যে স”ছন্দ গতির পরিচয় ফুটে উঠেছে তার তুলনা বাংলা সাহিত্যের খুব বেশী নেই।

পারাবারের ঢেউ দোলানী হানছে বুকে ঘা।

আমি খুঁজি ভিড়ের মাঝে চেনা কমল পা।


চমৎকার নয় কি? কবি- চিত্তের আবেগ-রঞ্জিত ভাষা প্রকৃতিকে করে তুলেছে সজীব ও মুখরঃ

পড়ছে মনে টগর চাঁপা বেল চামেলী যুঁই 

মধুপ দেখে যাদের শাখা আপনি যেত নুই।

হাসতে তুমি দুলিয়ে ডাল,

গোলাপ হয়ে ফুটতু গাল। 

গোলাপ হ’ত টলমলাতে ভুঁই। 


নজর“ল প্রেমের গান লিখেছেন দেদার, কবিতাও কম লেখেননি। গোপন প্রিয়া গানের আড়াল এ মোর অহঙ্কার  ভীর“ তুমি মোরে  ভুলিয়াছ হিংসাতুর প্রভৃতি বহু কবিতায় প্রেম বিরহের বহু চিত্রই কবি  এঁকেছেন। কিš‘ তাঁর অধিকাংশ কবিতায় প্রিয় মিলনের অনির্বচনীয় আনন্দের পরিবর্তে মান অভিমানের পরিচয়ই বেশী দেখতে পাওয়া যায়। গানের আড়াল কবিতার একটি স্তবক এইঃ


হয় তো কেবলি গাহিয়াছি গান, হয় তো কহিনি কথা,

গানের বাণী সে শুধু কি  বিলাস মিছে তার আকুলতা?

হৃদয়ে কখন জাগিল জোয়ার তাহারি প্রতিধ্বনি

কণ্ঠের তটে উঠেছে আমার অহরহ রণরণি,-

উপকুলে বসে শুনছে সে সুর বোঝ নাই তার মানে?

বেঁধেনি হৃদয়ে সে সুর দুলেছে দুল হয়ে শুধু কানে?


বলাবাহুল্য এই সবই অভিমানের কথা। কিš‘ অভিমান তো দীর্ঘ¯’ায়ী হতে পারে না। আতœাসমর্পণেই ভালবাসার শুধু নয় মান অভিমানেরও  চরিতার্থতা। তাই মন থেকে সমস্ত মান –অভিমান ঝেড়ে ফেলে এ মোর অহঙ্কার কবিতায় কবি বলতে পেরেছেনঃ


নাই বা পেলাম কণ্ঠে আমার তোমার কণ্ঠহার,

তোমায় আমি করব সৃজন এ মোর অহঙ্কার!

এবং চাই না দেবীর দয়া যাচি প্রিয়ার আঁখিজল,

একটু দুখে অভিমানে নয়ন টলমল।


নজর“লের প্রেম মানুষের এই চিরন্তন আঁখিজলেই খুঁজেছে সার্থকতা এবং পেয়েছে চরিতার্থতা। ভীর“ কবিতায় কবি কিশোরী চিত্তে নব এক অর্পূব চিত্র এঁকেছেন। এই কবিতার প্রতি স্তবকে প্রণয়-ভীতু স্পর্শ কাতর কিশোরী মনের ভালোবাসা মূর্তিমান হয়ে রূপ পেয়েছে: 


আমি জানি তুমি কেন কহ না‘ক কথা।

সেদিনো তোমার বনপথে যেথে

পায়ে জড়াত না লতা।

সেদিনো বে-ভুল ভুলিয়াছ ফুল

ফুল বিঁধিতে গো বিঁধেনি আঙুল,

মালার সাথে যে হৃদয়ও শুকায় জানিতে না সে বারতা

জানিতে না, কাঁদে মুখর মুখের আড়ালে নিঃসঙ্গতা।

আমি জামি তুমি কেন কহ না’ক কথা।


যে সব কবিতার কথা উল্লেখ করা হ’ল এই গুলি লেখা হয়েছে অপেক্ষাকৃত তর“ণ বয়সে যখন আবেগ উদ্বেগে নজর“ল চিত্ত ভরপুর, জীবন যখন তাঁর রাজনৈতিক ঘূর্ণা বর্তে আবর্তিত, আলোড়িত ও বিপর্যস্ত,তখন। কাজেই গভীরতর আতœজিজ্ঞাসা ও সু¯ি’র প্রেমের সুস্নিগ্ধ ও মধুরতর স্পর্শে এইসব কবিতা শান্ত সৌন্দর্যের মহিমা লাভ করেনি । সেই মহিমা লাভ করেছে তাঁর সংখ্যাতীত গানে যা রচিত হয়েছে এই কবিতাগুলোর অনেক পরে; যখন কবির জীবনে ফিরে এসেছে শান্তি ও ধৈর্য আবেগ যখন পরিণত হয়েছে ধ্যানে।


এই গান সংখ্যায় এত বেশী এবং তাতে প্রেমের এত বিচিত্র সুর ধ্বনিত হয়েছে যে তার সম্যক আলোচনা এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে সন্তব নয়। গানে শুধু জ্ঞান নয় কবির ভাষাও পেয়েছে এক শিল্পরূপ সুর- বৈচিত্র্যের তো কথাই নেই। এই সব গানে এক অদ্ভুত দক্ষতার সঙ্গে এক একটি ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এক-একটি লাইন যেন এক একটি চিত্র -শুধু চিত্র নয়, চিত্রের সঙ্গে ঘটেছে ভাবের সমন্বয়। শোনার দরকার নেই, এই সব গান শুধু পড়ে গেলেও যাকে বলা হয় কাব্য-সুধা-রস। জোর করে বলতে পারি তার অনির্বচনীয় আনন্দ থেকে কোনো পাঠকই বঞ্চিত হবে না।#


 

Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement

আরও দেখুন