সদ্য সংবাদ

 রংপুরে স্ত্রী ও দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধার, স্বামী আটক  ৮ ডিসেম্বর কালকিনি হানাদার মুক্ত দিবস  খুলনায় জলবায়ু পরিবর্তনে সক্ষমতা অর্জনে পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত  পঞ্চগড়ে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস  রংপুরে পরিবার কল্যাণ সেবা ও প্রচার সপ্তাহ উদ্বোধন  নবীনগরে জাপা নেতার বিরুদ্ধে ৮ বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ  পঞ্চগড়ে টিসিবি’র পেয়াঁজ বিক্রি শুরু  পঞ্চগড় থেকে দুর্নীতি বিরোধী নতুন ক্যাম্পেইনে  কোটচাঁদপুরে জোরপুর্বক অসহায় কৃষকের জমি দখলের চেষ্টা ১৪৪ ধারা জারী  ঝিনাইদহ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎে দায়ে অবশেষে বদলী  আড়াইহাজারে অস্ত্র সহ ৫ ডাকাত গ্রেফতার  নবীনগরে সেচ্ছাশ্রমে পল্লী চিকিৎসকদের চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ  সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদান রাখায় সাংবাদিক মোঃ জাফরুল হাসানকে সম্মাননা পদক প্রদান  পার্বতীপুরে পিকেএসএফ এর প্লট প্রদর্শনী  রংপুরে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রতিবন্ধি দিবস পালিত  পাটলাই নদীতে চাঁদা আদায়কালে ছয় চাঁদাবাজ আটক  তহশীলদার সহ সুনামগঞ্জে চার জুয়ারী কারাগারে!  নবীনগরে কৃষকের সম্পত্তি দখলের পায়তারা জোরপূর্বক ঘরের ভিটি তৈরী  ইয়োগার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে ঝিনাইদহের ইয়োগা মেডিটেশন সেন্টার  ঝিনাইদহের মধুহাটি ইউপি নায়েবের বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ বানিজ্য ও কর পরিশোধ রশিদ ছিড়ে ফেলার অভিযোগ

মে দিবস: যে লড়াই চলছে আজও

 Wed, May 1, 2019 11:54 PM
 মে দিবস: যে লড়াই চলছে আজও

এশিয়া খবর ডেস্ক:: শ্রম ছাড়া কোনো কিছুই উৎপাদন করা যায় না, এ সত্য অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

 কিন্তু মানুষ কতক্ষণ পরিশ্রম করবে? শ্রমশক্তি বিক্রি করে যে শ্রমিক, সে কি তার শ্রম-সময়ের মূল্য নির্ধারণ করতে পারবে?

কতক্ষণ কাজ করলে এবং কতটুকু মূল্য পেলে তার জীবন বিকশিত করার সুযোগ সে পাবে, জীবনের চাহিদা বলতে আসলে কী বোঝায়, শ্রমের কাজে নিয়োজিত পশু ও মানুষের ভূমিকা, মূল্য ও মর্যাদা কীভাবে বিবেচিত হবে, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন ও জীবন বিকাশের জন্য সংস্কৃতি নির্মাণে শ্রমের ভূমিকা কী, শ্রমিক কি শুধু প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনে শ্রম প্রদান করে, উৎপাদিত দ্রব্যের ক্রেতাদের এক বিপুল অংশ, লক্ষ কোটি শ্রমিক পণ্য না কিনলে তা বিক্রি হবে কীভাবে, শ্রমিকের মজুরি উৎপাদিত দ্রব্যের বিপণনে কী ভূমিকা রাখে, ন্যায্য মজুরি আসলে কত হবে, মুনাফা আসে কোথা থেকে, মুনাফা বৃদ্ধিতে মালিকের তৎপরতা কত ধরনের, শ্রমিক কেন মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে অংশ নেয়, শ্রমিকের জীবন এবং ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তি তার সন্তানদের জীবন কেমন হবে?

এ রকম অসংখ্য প্রশ্নের ঘনীভূত রূপ হিসেবে দাবি উঠেছিল ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস চাই। এ দাবির অন্তরালে ছিল আরেকটি দাবি- ৮ ঘণ্টা কাজ করে এমন মজুরি চাই যেন আমার পরিবার নিয়ে মানসম্পন্ন জীবনযাপন করতে পারি।

কিন্তু শ্রমিকদের দাবি যতই ন্যায়সঙ্গত মনে হোক না কেন, মুনাফা ও মজুরির সংঘাত এত তীব্র যে, আলোচনার পথে নয়, নিষ্ঠুর ও রক্তাক্ত পথে সরকার-মালিকরা এ আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিল। শিকাগো শহরের সেই রক্তাক্ত আন্দোলন শ্রমিকের বেদনা ও বিক্ষোভের রূপে ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে আর মে দিবস পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক দিবসে।

ফরাসি বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা এবং সাম্য প্রতিষ্ঠার চেতনার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল মে দিবসের চেতনা। ফরাসি বিপ্লব শুধু সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার স্লোগান তুলেনি, সঙ্গে সঙ্গে মতপ্রকাশের, মতপ্রচারের, মতপ্রতিষ্ঠার অধিকারের জন্ম দিয়েছিল। ১৭৮৯ সালের পরের পৃথিবী তাই আর আগের মতো থাকেনি।

মানুষ বাঁচবে কীভাবে, মর্যাদা আর অধিকার ছাড়া মানুষের জীবন কি পশুর জীবনের মতো হয়ে যায় না? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে শ্রমের ভূমিকার কথা ভাবতে হয়েছে। এডাম স্মিথ আর ডেভিড রিকারডো দেখালেন মানুষের শ্রমের ফলেই মূল্য তৈরি হয়। মূল্যের শ্রমতত্ত্ব স্বীকার করল শ্রমিকের শ্রমের ভূমিকার কথা; কিন্তু তার বিনিময়ে শ্রমিক কী পাবে সে প্রশ্নের সমাধান হল না।

গ্রাম থেকে উঠে আসা কারখানা শ্রমিকে পরিণত হওয়া শ্রমিক জীবন বাঁচাতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করছে; কিন্তু তার জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। অথচ মালিকদের প্রাচুর্য ও জৌলুস বাড়ছে। এ বৈষম্য তাদের মধ্যে বিক্ষোভের জন্ম দিতে শুরু করল যার ফলস্বরূপ কারখানা ভাঙা, ম্যানেজার হত্যার মতো ঘটনা ঘটতে শুরু করল।

কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে শ্রমিক বুঝল এ পথে সমাধান আসবে না; তাই ১৮৭১ সালে প্যারি কমিউন প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টাও করল শ্রমিকশ্রেণী। শোষণ থেকে মুক্তির আশায় এরকম বহু আন্দোলন আর পরাজয়ের বেদনার মধ্য দিয়েই জন্ম নিয়েছিল ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের আন্দোলন।

মে দিবসের চেতনা গড়ে উঠেছিল দীর্ঘ লড়াইয়ের পটভূমিতে। ১৮৮৬ সালের ১ থেকে ৪ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের শ্রমিকদের আন্দোলন গড়ে উঠেছিল দীর্ঘদিনের প্রস্তুতিতে আর লাখো শ্রমিকের অংশগ্রহণে। এ সংগ্রাম যে চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল তা আজও বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষকে পথ দেখায়।

১৮৮৬ থেকে ২০১৯ সাল। এ বছর মে দিবসের রক্তাক্ত সংগ্রামের ১৩৩ বছর পালন করবে শ্রমিক শ্রেণী। কিন্তু ইতিহাস কি শুধু অতীতের কথা বলে? যে ইতিহাস বর্তমানকে প্রভাবিত করে, পরিচালিত করে ভবিষ্যতের দিকে, সে ইতিহাস জীবন্ত।

সে ইতিহাস প্রশ্নবিদ্ধ করে সমাজকে, ব্যক্তির যুক্তিকে শানিত করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহস জোগায় এবং স্থবিরতা দূর করে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় উন্নততর স্তরে। মে দিবসের ইতিহাস তেমনি এক গতিময় ও সংগ্রামের ইতিহাস।

ফরাসি বিপ্লব ভেঙেছিল দীর্ঘদিনের সামন্তবাদী সমাজের স্থবিরতা। সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার স্লোগান তুলে মানুষের চিন্তাকে উন্নত মানবিক স্তরে উন্নত করেছিল। সে কারণে লক্ষ-কোটি মানুষের সংগ্রামে সামন্ত স্বেচ্ছাচারী সমাজ ভেঙে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয়েছিল; কিন্তু জনগণের মনে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় শ্রম শোষণের তীব্রতা তো কমলই না বরং বহুগুণ বেড়ে গেল।

শিল্পবিপ্লব উৎপাদন বৃদ্ধির নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে, গ্রাম থেকে লাখ লাখ কৃষক শিল্প-কারখানায় এসেছে, সৃষ্টি হয়েছে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের। একদিকে বেড়েছে উৎপাদন, অন্যদিকে বেড়েছে শ্রমিকদের ওপর কাজের চাপ। একের পর এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, নতুন যন্ত্রপাতির ব্যবহার উৎপাদনের বহুমুখী বিকাশ ঘটিয়েছে।

ফলে সমাজের সমৃদ্ধি, ধনীদের বিলাসিতা বৃদ্ধি পেয়েছে, পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা বেড়েছে, বেড়েছে দারিদ্র্য। জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করা শুধু নয়, নারী ও শিশুদের কারখানায় পাঠাতে বাধ্য হতে লাগল শ্রমজীবী মানুষ। মালিকরা মুনাফা বাড়াতে শ্রমঘণ্টা বাড়ানোর জন্য শ্রমিকদের ওপর যে চাপ প্রয়োগ করত তা শ্রমিকদের জীবন একেবারে দুর্বিষহ করে তুলেছিল।

ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা সর্বত্রই তাই কর্মঘণ্টা কমানোর দাবি জোরদার হয়ে উঠছিল। ১৮৩২, ১৮৩৯, ১৮৪৮, ১৮৫৭, ১৮৭৫ সালে বড় বড় শ্রমিক আন্দোলনে শ্রমিকরা তাদের দাবিতে যেমন রাজপথে নেমে এসেছিল, মালিকরাও তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সেসব আন্দোলনকে দমন করেছে।

১৮৮৬ সালে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি তাই কোনো তাৎক্ষণিক দাবিতে গড়ে ওঠা আকস্মিক আন্দোলন ছিল না। এটা ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে মুক্তির আশায় শ্রমিক শ্রেণীর লড়াইয়ের অংশ।

৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবির অন্তরালে ছিল ন্যায্য মজুরির আকাঙ্ক্ষা। প্রকৃতিতে যা আছে তা দিয়ে অন্য প্রাণীর চললেও মানুষের চলে না। তাই প্রকৃতিতে প্রাপ্ত বস্তুর ওপর মানুষ শ্রম প্রয়োগ করেই তার প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন করে।

শ্রমশক্তি প্রয়োগ করা থেকেই শ্রমিক নামের উৎপত্তি। শ্রমিক কাজ করে একই সঙ্গে নিজের ও সমাজের জন্য। মানুষ যা খায়, যা পরে, তার বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এমনকি মানুষের ভাষাও শ্রমের মাধ্যমে এবং শ্রমের প্রয়োজনে সৃষ্ট। শ্রমের ফলে মানুষ শুধু প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন করে না, উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করে। আজকের সমাজের যা কিছু সমৃদ্ধি তা উদ্বৃত্ত সৃষ্টির ফলেই সম্ভব হয়েছে। এ উদ্বৃত্ত আত্মসাৎ করার ফলেই একদল সম্পদশালী হয় আর বাকিরা হয় নিঃস্ব।

অর্থনীতিবিদরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন দীর্ঘদিন ধরে কেন এ ঘটনা ঘটে? পেটি, অ্যাডাম স্মিথ, রিকারডো দেখিয়েছেন শ্রমের ফলে মূল্য তৈরি হয় পরবর্তী সময়ে কার্লমাক্স দেখালেন কীভাবে উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি হয়। ১৮৪৮ সালে মার্ক্স-এঙ্গেলস কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো আর পরবর্তী সময়ে মার্ক্স ক্যাপিটাল লিখে দেখালেন এযাবৎকালের লিখিত ইতিহাস একদিকে যেমন শ্রেণী-সংগ্রামের ইতিহাস, অন্যদিকে মানুষের বিকাশের ইতিহাস।

কিন্তু জ্ঞানবিজ্ঞানের বিকাশ, শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ যা মানুষের শ্রমের ফল, তা থেকে কি বঞ্চিত হবে শ্রমজীবী মানুষ? জীবিকার জন্য দিনের ১২/১৪/১৬ ঘণ্টা যদি হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হয়, তাহলে শ্রমজীবী মানুষ কীভাবে তাদের জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাবে। আর বিপুলসংখ্যক মানুষকে বঞ্চিত রেখে গোটা সমাজের সুষম বিকাশ কি সম্ভব হবে?

যন্ত্রের আবিষ্কার ও তার আধুনিকীকরণ কি মানুষের শ্রম সময় লাঘব করবে না? কতক্ষণ কাজ করলে একজন মানুষ তার জীবনধারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে গিয়ে শ্রমজীবী মানুষের দাবি উচ্চারিত হয়েছিল ৮ ঘণ্টা কাজ, এটাই হবে কর্মসময়।

কিন্তু মজুরি যদি ন্যায্য না হয় তাহলে ৮ ঘণ্টা কাজের ফলে যে মজুরি পাবে তা দিয়ে সংসার চলবে না। তাই জীবনযাপনের জন্য শ্রমিকদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য হতেই হবে।

৮ ঘণ্টা কর্ম-সময়ের সঙ্গে ন্যায্য মজুরির দাবি যে কত যৌক্তিক তা ১৩২ বছর পরও আজ শ্রমিক শ্রেণী অনুভব করছে। শ্রমিক শ্রেণী এটাও দেখছে যে, যত গণতন্ত্রের কথা বলা হোক না কেন, শোষণমূলক ব্যবস্থা বহাল রেখে ৮ ঘণ্টা কর্মসময় এবং ন্যায্য মজুরি আদায় করা সম্ভব নয়।

উৎপাদন বাড়ছে সারা বিশ্বেই; কিন্তু শ্রমিকের জীবনে তার ছোঁয়া লাগছে না। উৎপাদন বাড়ছে, শ্রমিকের বেকারত্বও বাড়ছে, এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে পড়েছে সারা বিশ্ব। প্রযুক্তির উদ্ভাবন, আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার পুঁজিপতিদের মুনাফা বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ।

পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শ্রমিকের কর্মসময়, ওভারটাইমের চাপ। উৎপাদন বাড়ছে, মুনাফা বাড়ছে, কর্ম-সময় বাড়ছে আর কর্মসংস্থান কমছে- এ দুষ্টচক্রে আটকে পড়েছে পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি। মে দিবসের চেতনা তাই আরও প্রাসঙ্গিকরূপে আবির্ভূত হচ্ছে।

শ্রমিকের শ্রমে উৎপাদিত দ্রব্যে শ্রমিকের অধিকার নেই। অর্থনীতির প্রতিটি সূচকের উন্নতি ঘটানোর পেছনেই থাকে শ্রমিকের ঘাম। কিন্তু সবচেয়ে কম পুষ্টি, কম শিক্ষা, কম স্বাস্থ্য সুবিধা, কম বিশ্রাম, কম নিরাপত্তা যেন শ্রমিকদের জন্যই বরাদ্দ। অথচ সারা বিশ্বেই খাদ্য উৎপাদনসহ ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন বাড়ছে।

বাংলাদেশেও জিডিপি বৃদ্ধির হার, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পরিমাণ, রফতানি আয় বৃদ্ধিসহ উন্নয়ন যত বাড়ছে তার সঙ্গে এ কথাটাও যুক্ত হয়ে আছে, বাংলাদেশ সস্তা শ্রমিকের দেশ। বলা হয়, এর কারণ বাংলাদেশের শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা কম। কিন্তু উৎপাদনশীলতা শুধু শ্রমিকের শ্রমশক্তির ওপর নির্ভর করে না।

মেশিন, ম্যানেজমেন্ট এবং ম্যানপাওয়ার এ তিন এম যুক্ত আছে উৎপাদনশীলতার সঙ্গে। একটি সহজ উদাহরণ থেকেও বিষয়টা বোঝা যাবে। রিকশাচালক অনেক পরিশ্রমী; কিন্তু তারচেয়ে কম পরিশ্রম করেও সিএনজি অটোরিকশাচালকের উৎপাদনশীলতা অনেক বেশি। শিক্ষিত শ্রমিক, প্রশিক্ষিত শ্রমিক, দক্ষ শ্রমিক যাই বলি না কেন, তা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন শ্রমিকের আয় এবং অবসর।

আয় বাড়লে এবং অবসর সময় পেলেই তো শ্রমিক তার দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পাবে। তা যেমন সমাজের অগ্রগতি সৃষ্টি করবে, তেমনি বৈষম্য কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে। শোষণমূলক সমাজ যেমন বঞ্চিত করে শ্রমজীবীকে, তেমনি জন্ম দেয় বিক্ষোভ ও বিদ্রোহের। মে দিবসের সংগ্রাম ছিল তেমনি এক বিদ্রোহ যা শুধু শ্রমিকদের দাবিতে নয়, সমাজ বিকাশের প্রয়োজনে সংঘটিত হয়েছিল।

বৈষম্য, বেকারত্ব- শিল্পের আধুনিকায়ন ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সামনে প্রধান বাধা, মে দিবসের চেতনায় এ সংকট উত্তরণ করতে হবে। আধুনিকায়ন যদি উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাতের জন্য কাজে লাগানো হয় তাহলে বেকার সমস্যা, বৈষম্য যে তীব্র রূপ লাভ করবে তা বর্তমান পৃথিবীর দিকে তাকালেই বোঝা যায়।

৮ জন ধনীর কাছে ৩৬৫ কোটি মানুষের সমান সম্পদ পুঞ্জীভূত, খাদ্য উৎপাদনে সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ হচ্ছে, মঙ্গলগ্রহে মানুষ পা রাখতে যাচ্ছে, মানুষবিহীন গাড়ি, শ্রমিকবিহীন কারখানা, রোবট দিয়ে কাজ করানোর ঘোষণা আসছে। আউটসোর্সিংয়ের ব্যাপকতা চাকরির নিশ্চয়তা কেড়ে নিচ্ছে; চাকরিবিহীন শ্রমিক, ক্রয়ক্ষমতাবিহীন ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জন্ম দিচ্ছে।

রোবট দিয়ে গাড়ি, কাপড়, ওষুধ উৎপাদন হবে; কিন্তু তা ব্যবহার করবে যারা, তাদের যদি ক্রয়ক্ষমতা না থাকে তাহলে অতি উৎপাদনের সংকট সৃষ্টি হবে। মানুষের প্রয়োজন থাকবে, উৎপাদনের প্রাচুর্য থাকবে; কিন্তু বেকার মানুষ কিছু কিনতে পারবে না, তাহলে এ সমস্যার হাত থেকে মুক্তি আসবে কীভাবে?

নীরব থেকে শুধু দর্শক হলে এ সমস্যার অবসান হবে না। কর্ম সময় কমানো, মানসম্পন্ন মজুরি, উদ্বৃত্ত আত্মসাৎ বন্ধ করার আন্দোলন শুধু শ্রমিকশ্রেণী নয়, মানবজাতিকেই বাঁচাবে।

ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে অগাস্ট স্পাইস যে ঐতিহাসিক উক্তি করেছিলেন তা আজও আমাদের আলোড়িত করে। তিনি বলেছিলেন, ‘The time will come when our silence will be more powerful than the voices you strangle today.’ ৮ ঘণ্টা কর্ম-সময়ের দাবিতে ১৮৮৬ সালের ১ ও ৪ মে আন্দোলন এবং শ্রমিক নেতাদের ফাঁসির ঘটনায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।

১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কংগ্রেস ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালনের ঘোষণা দেয়। ১৯১৯ সালে আইএলও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস ও ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ঘোষণা করা হয়।

৮ ঘণ্টা কর্মদিবস আন্দোলনের নেতা অগাস্ট স্পাইস, এঙ্গেলস, ফিশার ও পারসনস জীবন দিয়ে আন্দোলনের যে যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিলেন তা আজও নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন সংকটে নতুনভাবে বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমিকের অধিকার ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে পথ দেখায়। অতীতের শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের সংগ্রাম আর ভবিষ্যতের স্বপ্নপূরণে মে দিবস চেতনা আজও তাই অফুরন্ত; অফুরন্ত প্রেরণার উৎস।

রাজেকুজ্জামান রতন : সাধারণ সম্পাদক, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট

Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement

আরও দেখুন