সদ্য সংবাদ

  ৯০ দিনের মিশন শেষে পৃথিবীতে ফিরেছেন চীনা নভোচারীরা   দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে সংশ্লিষ্টতা, যুবলীগ নেতা বহিষ্কার  এক হাজার টাকা দেওয়ার ভয়ে পালায় জামালপুরের ৩ ছাত্রী: পুলিশ  মেট্রোরেলের মালামাল ভাঙারির দোকানে বিক্রি করতো চক্রটি  সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে বৃদ্ধ চাঁদাবাজ গ্রেফতার!   মানুষের কাজই সমালোচনা করা’   কিস্তি চাওয়ায় এনআরবিসি ব্যাংক কর্মকর্তাকে মারধর  অ্যাসাইনমেন্টের সাথে টাকার কোনো সম্পর্ক নেই : শিক্ষামন্ত্রী  কবে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেবেন জানেন না রাসেল   ১০ দৈনিক পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল  পঞ্চগড়ে গণহত্যার পরিবেশ থিয়েটার নির্মাণ  জমি নিয়ে বিবাদ সাঘাটায় বসতবাড়িতে হামলা লুটপাট  বিয়েকাণ্ড: 'ঘুষের' টাকা ফেরত দিল সেই পুলিশ   অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এটিএম বুথের ২৪ লাখ টাকা লুট   আরেক বার মনোয়ান চাইবো আনোয়ার হোসেন  বাংলাদেশি কিশোরী চিঠি লিখে বিশ্বজয় করলেন   ফোনালাপ ফাঁস ও মিডিয়ায় প্রচার করা ঠিক নয়: হাইকোর্ট  আমরুল্লাহ সালেহ’র বাড়ি থেকে বিপুল টাকা উদ্ধার তালেবানের   শিক্ষা কার্যক্রমকে সময়োপযোগী করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী   বীর মুক্তিযোদ্ধা সামসুল হক মোল্লার মৃত্যু

বিষ পেরিয়ে একুশে পা

গল্প লিখলেন

 Sun, Jan 31, 2021 11:29 PM
          বিষ পেরিয়ে একুশে পা

মধুপর্ণা রায়:: দোতলার ব্যালকনি থেকে প্রায় রোজই ছেলেটাকে দেখছে নন্দিনী।

 বেলা বারোটা নাগাদ আসে। নন্দিনীদের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে, সোনাঝুরি গাছটার তলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে এদিক ওদিক তাকায়। কখনো মাথা তুলে রেখে গাছটাকেও দেখতে থাকে।  এই নিয়ে চার  দিন দেখল নন্দিনী।  অন্য কোনো ফ্ল্যাট থেকে অবশ্য এ নিয়ে কোনো কথা শোনে নি সে। কেউ কি খেয়ালই করছে না? কী  জানি!
সমস্তদিনে নন্দিনীর তেমন কাজ আর কোথায়? চাকরি করতে ইচ্ছেই হয় নি কখনো। মাঝে মধ্যে অবশ্য শাড়ির ব্যবসা করতে ইচ্ছে হয়। আজকাল ঘরে ঘরে এই এক চল হয়েছে। ফেসবুক খুললেই কত যে গ্রুপে আমন্ত্রণ,  কত বিজ্ঞাপন।  সুতীর্থ ডাক্তার। সার্জেন। ব্যস্ততা যেমন থাকার তেমনি। নন্দিনী একাই ঘুরে বেড়ায় এ ঘর থেকে ও ঘর। এই অ্যাপার্টমেন্টের অন্য ফ্ল্যাটের বৌয়েরা বেশিরভাগই চাকরি করে। সেজেগুজে এগারটার মধ্যে বেরিয়ে যায়। নন্দিনী ব্যালকনি থেকে দেখে। কখনো হাত নাড়ে। কখনো না দেখার ভান করে। কিন্তু রোজকার এই বের হওয়া, বাইরের ঘটনার দায়িত্ব নেওয়া, এই এতসব তার ভালো লাগে না। সে যে প্রথাগতভাবে দারুণ  সুগৃহিণী, এমনও নয়। সুতীর্থ রান্নার লোক, ঠিকে লোক, বাজার করার লোক সবই রেখে দিয়েছে। নন্দিনীর সে অর্থে শুয়ে বসেই দিন কাটে।  তাই হয়তো এসব তার নজরেই এসে যায়।
  ছেলেটা এসেছে কিনা দেখতেই নন্দিনী ওই সময়ে একবার ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। চোখে চোখে হতেই গতকাল ছেলেটা চোখ সরিয়ে নিয়েছিল। আজ এখনো আসে নি। ঘড়ি দেখল নন্দিনী।  এগারটা বেজে চল্লিশ। সে ভাবল, স্নানটা সেরে নেবে। রান্নার সুধাদি কী ফোড়ন দিয়েছে কে জানে! ঝাঁঝালো  গন্ধ বেরোচ্ছে। অ্য্যাপার্টমেন্টের গ্রাউন্ড ফ্লোরে ডাঃ অনিরুদ্ধ বসু। কার্ডিওলজিস্ট। তাঁর  স্ত্রী মণিদীপাদি  রকমারী রান্না করে। এ-ই তার দুরন্ত নেশা। গন্ধে মাতাল হয়ে যায় চারদিক। সব ফ্ল্যাট  মথিত করে তোলে  কতোরকম গন্ধ যে!  নন্দিনীর ওসবে আনন্দ নেই। সে ওই গন্ধ থেকে পালাতে ব্যালকনির ফুলে মুখ ডুবিয়ে দেয়।  
                 স্নান সেরে বেরিয়ে নিয়মের পূজো সারতে সারতেও  নন্দিনী ছেলেটার কথা ভেবে ফেলছিল।  রোজ রোজ আসে কেন? ঘন্টা দুই থাকে। তারপর চলে যায়। উফফ! পূজোর সময় এত এইসব মনে আসছে কেন?! নন্দিনী জোরে জোরে বজরংবলী মন্ত্র আওড়াচ্ছে। চোখ বন্ধ। হাত জোড়। হে পবনপুত্র, হে বজরংবলী.... আমি যেন তোমার একনিষ্ঠ ভক্ত হতে পারি। আমার সংসারে আরো  সমৃদ্ধি আসুক। শান্তির আলো আসুক। আমার স্বামীর মঙ্গল করো তুমি। সে নিজে যে নার্সিংহোমের মালিক হতে চলেছে,  সেই স্বপ্ন তুমি পূরণ করো।  মুম্বাইতে যে ফ্ল্যাট কিনব আমরা, তাতে যেন কোনো বাধা না আসে প্রভু।  ছেলেটা কি এসে গেলো এর মধ্যে? আজ কি একটু কথা বলবে? সমস্তদিনে কথা বলারও মানুষ নেই। ব্যস্ত...  সবাই ব্যস্ত! নন্দিনীর পূজো বার বার নষ্ট হচ্ছে! সে লম্বা প্রণাম করতে করতে এই কথাটাই ভাবতে পারলো যে পূজোয় তার একটুও মন নেই।এবং  এ জীবনে কোনো মহৎ কাজ তাকে দিয়ে হবে না।
       ব্যালকনি থেকে   নন্দিনী দেখল, ছেলেটা এসেছে। চুপ করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ওইরকমই।  নন্দিনীর শরীর এবং মনে একটা আলগা শৈথিল্য থেকে যায়। অবসাদের মেঘ। কিন্তু এই মুহূর্তে তার কৌতূহল তীব্র হচ্ছিল।  সে ঠিক করল, আজ ছেলেটার মুখোমুখি হবে। দিনকাল একটুও ভালো নয়। রোজ রোজ এসে , দাঁড়িয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ  করে নিচ্ছে বোধহয় ছেলেটা! খুব দ্রুত পোশাক পালটে নিচে নামল নন্দিনী।
 মুখোমুখি সে আর ছেলেটা। মাঝখানে  দীর্ঘ রাস্তা। নিউআলিপুরের এই ব্লকে রোজকার কোলাহল উত্তাল নয়। অভিজাত এলাকা। রাস্তায় চলাচল থাকে, এ পর্যন্তই। নন্দিনীর মনে হলো, ছেলেটার বয়স চোদ্দ পনেরর বেশি নয়। ভুসরো জিনস প্যান্ট।  ফ্যাকাশে হলুদ শার্ট। বার বার নাক টানছে। ঠান্ডা লেগেছে হয়তো।  নন্দিনীকে দেখেছে। নন্দিনী ওকে স্থির চোখে দেখছিল। কালো ইনোভাটা বেরিয়ে যেতেই নন্দিনী রাস্তা পার হচ্ছে। হুশ করে যেন উড়ে গেলো ছেলেটা। একটা লম্বা দৌড় শুধু। নন্দিনী কেমন হতবাক হয়ে দৌড়টা দেখল দাঁড়িয়ে। ফিরে আসতে আসতে ঠিক করল, বিষয়টা অ্যাপার্টমেন্ট সেক্রেটারি মিস্টার সান্যালকে সে জানাবে।
  সব শুনে বেশ কিছুক্ষণ যেন  ভাবনায় ছিল সুতীর্থ।  
-- ছেলেটা চলে যায় কটা নাগাদ?
-- ঘন্টা দুয়েক পর। মানে, আমি দু'দিন তিনটে নাগাদ ব্যালকনিতে গিয়ে আর ওকে দেখি নি।
-- হুঁ। জানাও সান্যালকে। একটা মিটিং হলে ভালোই হয়। এট লিস্ট একটা গ্যাদারিং হোক। অনেকদিন আড্ডা হয় না।
-- মানে?!
-- কিসসু না। নো ইন্টারনাল গ্রেভ মিনিং।  তোমার কোনো কাজ নেই। তবু যাই হোক ডিটেকটিভ হতে চাইছ! দ্যাটস নট ব্যাড। কী একটা যেন দেখো? গিন্নী গোয়েন্দা নাকি কী...!!  হা হা হা হা......
নন্দিনী তাকিয়ে ছিল। সে তার প্রতিষ্ঠিত সার্জেন স্বামীকে দেখছিল।  সুতীর্থ কৌতুকের সঙ্গে কী একটা মিশিয়ে বলল-- তোমরা মেয়েরা মাইরি ইনকরিজিবল!  আজই তাহলে সান্যালকে এই গুরুগম্ভীর বিষয়টা জানাও কিন্তু। সানডে একটা পার্টি হয়ে যাক।   নন্দিনীর মনে হচ্ছিল.... আসন্ন কোনো ঘটনাকে সে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে পাচ্ছে! কিছু তো ঘটবেই!  তাকে রাস্তা পার হতে দেখে ছেলেটা পালিয়ে কেন গেলো!!
  নিজের চেষ্টায় একটা মিটিং অ্যারেঞ্জ করতে পেরেছে নন্দিনী। উঁচুদরের ব্যবসায়ী মণিময় সান্যাল বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন। প্রথমে নন্দিনীর কাছে শুনে নিজে বিষয়টাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছিলেন। তারপর ছেলেটিকে ধরবেন বলে মুখোমুখি হতে যেতেই   হরিণের পায়ে দৌড়ে পালিয়েছে ও। এবার সমস্ত ফ্ল্যাট  বাসিন্দাদের নিয়ে মিটিং।  খাও পিও এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো।
  জরুরি মিটিংয়ে  চোখ গোল করে বসে রইল কতজন। লক্ষ কাহিনীর অবতারণা হলো ইদানীং সামাজিক অবক্ষয়ের।  দরিদ্র শ্রেণি যে কী ভয়ংকর চতুর....  সে নিয়েও বললেন ডাক্তাররা। কতো ধরনের বিপর্যয় ওই কিশোর ছেলেটিকে মাধ্যম করে ঘটেও যেতে পারে সে নিয়ে কল্পনার গল্প তৈরি হলো অনেক। পেগের পর পেগ আর মণিদীপা বসুর নিজের হাতের রকমারী স্ন্যাকসের রফা হলো দারুণ।  
এবং ঠিক হলো নির্দিষ্ট দিন। কৌশলে ওকে ঘিরে ফেলবে এই অ্যাপার্টমেন্টের জনগণ।  নন্দিনী আজ অনেক দিন পর প্রশংসিত হলো। ঘরে এসে প্রায় মাতাল সুতীর্থ অবশ্য হেসেছিল। - ধুস! যত্তসব!
নন্দিনীর মনে হলো, সুতীর্থ কোনো কিছুর গুরুত্ব বোঝে না, কেবল যান্ত্রিক ভাবে মানুষের দেহ কাটাছেঁড়া করে। এবং নন্দিনীর দৃষ্টি,  তার  সচেতন বুদ্ধির প্রশংসা সুতীর্থর অহমেই নিশ্চয় ঘা দিচ্ছে কোথাও। নন্দিনী আড়ালে মুখ ঘুরিয়ে একটু হাসল।
     ওই তো আসছে ছেলেটা। মাঝারি হাইট। তামাটে  রঙে ধুলোর মালিন্য। দাঁড়ালো। মুখ তুলে গাছের দিকে দেখছে। শ্বাস নিল দু' বার। হাতের পাতায় মুখ ঘষছে।  নাক টানছে। ঠিক যেমন যেমন অ্যাকটিভিটির কথা নন্দিনী বলেছিল সেদিন মিটিংয়ে।  ওরা আজ আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। বেছে নিয়েছে ছুটির দিন। একদল রাস্তার ওপারে। অন্যদল এপারে। সব মিলিয়ে ওরা জনা পনের আজ। কোন মস্ত কাজেই বা একশো শতাংশের যোগদান থাকে?
 সেক্রেটারির ইঙ্গিত আসা মাত্র দুই দিক থেকে দুই দল যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এগিয়ে এলো। ছেলেটি জোরে শ্বাস নিয়ে ছাড়তে পারার ঠিক আগের মুহূর্তে ঘিরে ফেললো তাকে। ও অসম্ভব দ্রুত চোখ ঘুরিয়ে এদিক- ওদিক দেখছে। কিন্তু আজ পালাবার পথে চক্রব্যূহ।  
-- অ্যাই, তুই কে রে?
ছেলেটি তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল।
-- নাটক করছে! এখুনি দেখলে? চোখ কেমন ঘোরাচ্ছিল?! ব্যস! এক্সপ্রেশন চেঞ্জ!!
-- অ্যাই, তোর নাম বল।
ছেলেটির অবোধ মুখ।
-- ধরে পুলিশে দাও। এই, মিস্টার কানোরিয়াকে একটা ফোন করুন তো অখিলেশদা...নাম বল শিগগিরী... নইলে এক্ষুনি পুলিশ ডাকব কিন্তু।
-- ভবেন।
-- বানী ফুটেছে।   হাসল ওরা।
-- এখানে রোজ আসিস কেন? কী মতলব?
ভবেন চুপ।
-- কী চাই তোর এখানে? আমরা কিন্তু সব জানি।
-- ভালো চাস তো বলে ফেল। কে পাঠায় তোকে এখানে? সব লক্ষ্য করিস দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে! কী ব্যাপারটা কী?
-- তবে রে শালা! মেরে তোমার দম ফাটাব!
-- এই এই... দাঁড়াও না! এত উত্তেজিত হয়ে যায় না এই মানুষটা...!
-- কেন আসিস, কে পাঠায় বল কিন্তু।
ভবেনের চোখে কেমন বিশাল অবাক।
-- কেউ পাঠায় না।
-- চালাকি?! তুই কি বসকে বাঁচাচ্ছিস?! পাছায় একটা লাথ দিয়ে..
-- ধ্যাৎ!  বলছি, এরকম কোরো না!!
-- কেউ পাঠায় না। আমি নিজে আসি।
-- নিজে আসিস?! কেন আসিস সেটা বল।
-- আমি এখানে গন্ধ নিই।
-- কী নিস?!
ভবেন আচমকা বেশ জোরে বলল-- গন্ধ।
-- গন্ধ?! কিসের গন্ধ রে শালা! ফুলের না হাগার?
ওরা এমন চমৎকার রসিকতায় হেসে উঠল হো হো।
-- ওই ভবেন না ভবেশ... কিসের গন্ধ নিতে তুই আসিস সেটা বল! গন্ধ নিতে আসে বলে!! ভেবে দেখো একবার! উফফফ....কিসের  গন্ধ রে?
ভবেন চোখ নামিয়ে রেখেছে। অস্ফুটে বলল--  ওই ঘরে কতো যে রান্না হয়,  সেই গন্ধ। খাবারের।
চক্রব্যূহ থমকে গেলো। গুঞ্জন তারপর। আর এতটুকু তার অন্যমনস্ক ফাঁক দিয়ে হরিণের মতো পালিয়ে গেলো শীর্ণ ভবেন। সে আর কখনো আসে নি।।


#মুক্ত_দেওয়াল

Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement

আরও দেখুন